ফলের রাজ্যে নতুন রানি: বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘গৌড়মতি আম’

আমের রাজধানী বাংলাদেশে প্রতি বছরই যুক্ত হয় নতুন নতুন জাত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমপ্রেমী ও চাষিদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে যে জাতটি, তা হলো গৌড়মতি আম। বাংলার প্রাচীন জনপদ ‘গৌড়’ অঞ্চলের নামানুসারে নামকরণ করা এই আমটি যেন সত্যি এক অমূল্য রত্ন বা ‘মতি’। স্বাদ, সুবাস আর মিষ্টির দিক থেকে এটি টেক্কা দিচ্ছে ফজলী, ল্যাংড়া, খিরসাপাত, এমনকি সুমিষ্ট আম্রপালিকেও!

নামকরণ ও উৎপত্তির ইতিহাস

বহু বছর আড়ালে-আবডালে থাকলেও, যখনই এই আমের গুণাগুণ সামনে এসেছে, তখনই এর কদর রাতারাতি বেড়ে গেছে। প্রাচীন গৌড় অঞ্চলের ‘গৌড়’ এবং মূল্যবান রত্নসম্ভার ‘মতি’—এই দুই শব্দ মিলিয়ে এর নাম রাখা হয়েছে ‘গৌড়মতি’

বর্তমানে মাঠপর্যায়ে এই আমের সম্প্রসারণে কৃষি অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই যশোর, মাগুরাসহ দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হর্টিকালচার সেন্টারে গৌড়মতি আমের চারা ব্যাপকভাবে বিক্রি ও চাষ হচ্ছে।

মিষ্টতার লড়াইয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে ‘গৌড়মতি’

আমের স্বাদের আসল রহস্য লুকিয়ে থাকে তার মিষ্টতার পরিমাণের (TSS) ওপর। চলুন দেখে নেওয়া যাক বাংলাদেশের জনপ্রিয় আমগুলোর তুলনায় গৌড়মতি কতটা এগিয়ে:

আমের জাতমিষ্টতার পরিমাণ (শতাংশ)
ফজলী১৭.৫%
ল্যাংড়া১৯.৭%
আম্রপালি২৩%
গৌড়মতি২৫%

টেবিলের তথ্যই বলে দিচ্ছে, মিষ্টতার দিক থেকে আম্রপালিকেও হার মানিয়ে ফলের বাজারে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে গৌড়মতি।

গৌড়মতি আমের অনন্য বৈশিষ্ট্যসমূহ

বাণিজ্যিক চাষাবাদ কিংবা বাড়ির ছাদবাগান—সব জায়গার জন্যই গৌড়মতি আম এক আদর্শ পছন্দ। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • সর্বোচ্চ মিষ্টতা: এই আমের মিষ্টতার পরিমাণ ২৫ শতাংশ, যা প্রচলিত প্রায় সব জাতের চেয়ে বেশি।
  • আদর্শ ওজন: প্রতিটি আমের গড় ওজন প্রায় ২৫০ গ্রাম, যা দেখতে বেশ আকর্ষণীয় ও বিপণনের জন্য সুবিধাজনক।
  • স্বাদ ও সুঘ্রাণ: আমটি অত্যন্ত সুস্বাদু, সুমিষ্ট এবং এর রয়েছে মন মাতানো চমৎকার সুঘ্রাণ।
  • আঁশহীন ও রসালো: সম্পূর্ণ আঁশবিহীন হওয়ায় খাওয়ার সময় মুখে মাখনের মতো মিলিয়ে যায়। এর খোসা এবং আঁঠি দুটোই বেশ পাতলা, যার ফলে এতে পাল্প বা শাঁসের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে।
  • চমৎকার রঙ: পাকার পর আমের গায়ের রঙ আকর্ষণীয় হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
  • নিয়মিত ও উচ্চ ফলনশীল: এটি একটি উচ্চ ফলনশীল জাত। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, অনেক আমের মতো এতে ‘অফ-ইয়ার’ নেই; অর্থাৎ প্রতি বছরই গাছে প্রচুর পরিমাণে ফল ধরে।

কেন চাষ করবেন গৌড়মতি আম?

গৌড়মতি কেবল খেতেই সুস্বাদু নয়, এটি চাষিদের জন্যও অত্যন্ত লাভজনক। যখন বাজারের অন্যান্য প্রচলিত আম শেষ হয়ে যায়, ঠিক তখন (নাবি বা লেট ভ্যারাইটি হিসেবে) বাজারে আসে গৌড়মতি। ফলে বাজারে এর চাহিদা থাকে আকাশচুম্বী এবং চাষিরা পান সর্বোচ্চ বাজারমূল্য।

উপসংহার: খাঁটি দেশি স্বাদ আর আধুনিক পুষ্টিগুণের এক অপূর্ব সমন্বয় এই গৌড়মতি আম। আপনি যদি নিরাপদ ও সেরা স্বাদের আমের খোঁজে থাকেন, তবে আপনার খাদ্যতালিকায় কিংবা বাগানে আজই যুক্ত করুন বাংলার এই নতুন রত্ন—গৌড়মতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *